Header Ads Widget

তিস্তার তীর রক্ষা প্রকল্পে ‘পুকুর চুরি’

 



সাইনবোর্ডহীন কাজে লুটপাটের মহোৎসব, ওজনেই মিলছে বড় গরমিল

কুড়িগ্রাম (রাজারহাট) প্রতিনিধি :
তিস্তা নদীর তীর সংরক্ষণে শত কোটি টাকার প্রকল্প চললেও প্রকল্প এলাকায় নেই কোনো কাজের তথ্যসংবলিত সাইনবোর্ড। অথচ দিন-রাত চলছে বিশাল কর্মযজ্ঞ। শত শত শ্রমিক কাজ করলেও সংবাদকর্মী দেখলেই বদলে যায় পরিস্থিতি। দ্রুত চালু করা হয় সেচ যন্ত্র, পানি ছিটানো হয় স্লোপিংয়ের জিও ব্যাগে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পজুড়ে চলছে অনিয়ম, গোপনীয়তা আর দুর্নীতির উৎসব।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও রংপুর জেলার তিস্তা নদীর ভাঙনপ্রবণ প্রায় ১৯ কিলোমিটার এলাকা রক্ষায় প্রায় ২৪৫ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড। দুই ধাপে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের কাজ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ ও উদ্বেগ। বিশেষ করে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার প্রায় ৩ কিলোমিটার এলাকায় অনিয়মের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি।

বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের ডাংরাহাট, গাবুরহেলান ও রামহরি এলাকার বিভিন্ন প্যাকেজে সরকারি নীতিমালা মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। দায়িত্বপ্রাপ্তদের আচরণেও দেখা গেছে অস্বাভাবিক সতর্কতা। স্থানীয়দের দাবি, সাংবাদিক বা বাইরের কাউকে দেখলেই সংশ্লিষ্টরা তৎপর হয়ে ওঠেন, যা পুরো প্রকল্প ঘিরে জনমনে সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।

প্রকল্পের সিডিউল অনুযায়ী প্রতিটি জিও ব্যাগে বালু ও সিমেন্টসহ ওজন থাকার কথা ১৭৫ কেজি। তবে সরেজমিনে একাধিক স্থানে ওজন করে দেখা গেছে, বেশিরভাগ বস্তার ওজন ১৪২ থেকে ১৪৯ কেজির মধ্যে। গত ফেব্রুয়ারিতে রামহরি মৌজায় এবং সম্প্রতি গাবুরহেলান এলাকায় ডিজিটাল মেশিনে ওজন করেও একই ধরনের ঘাটতির প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে স্থানীয়রা জানান।

স্থানীয় বাসিন্দা মাহবুবুর রহমান বলেন,
“বস্তার ওজন তো কম দেওয়া হচ্ছেই, পাশাপাশি সিমেন্টের পরিমাণও ঠিক রাখা হচ্ছে না। এভাবে কাজ হলে বর্ষায় এই বাঁধ টিকবে না।”

আরেক বাসিন্দা আক্তার হোসেনের অভিযোগ,
“এখানে রীতিমতো পুকুর চুরি হচ্ছে। নিম্নমানের বালু-সিমেন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে। আবার স্লোপিংয়ের দৈর্ঘ্যও কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের কাজের নামে নদী থেকে বালু উত্তোলন করে বাইরে বিক্রির সঙ্গেও জড়িত একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। শ্রমিক সর্দার আব্দুস সালামের নেতৃত্বে এই সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

দুর্নীতির মাত্রা এতটাই বেড়েছে যে, ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের গতিয়াসাম এলাকায় এলাকাবাসীর তোপের মুখে প্রায় ৮ হাজার নিম্নমানের জিও ব্যাগ বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

এদিকে চলমান কাজের বিষয়ে তথ্য জানতে চাইলে দায়িত্বপ্রাপ্ত এসডি মইদুল ইসলাম তথ্য দিতে গড়িমসি করেন বলে অভিযোগ সাংবাদিকদের। পরে অফিসে দেখা করার কথা বললেও নির্ধারিত সময়ে তাকে অফিসে পাওয়া যায়নি।

তবে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল ইসলাম বলেন,
“তিস্তা তীর সংরক্ষণ কাজে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে এসডিকে পাঠানো হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিম্নমানের জিও ব্যাগও বাতিল করা হতে পারে।”

স্থানীয়দের আশঙ্কা, অনিয়ম ও নিম্নমানের কাজ বন্ধ না হলে আগামী বর্ষায় তিস্তার ভয়াবহ ভাঙনের ঝুঁকি আরও বাড়বে। তারা প্রকল্পের পুরো কাজের সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

Post a Comment

0 Comments